চালুর আগেই জংয়ে গিলে খাচ্ছে আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেলপথ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নির্মিত এই রেলপথ উদ্বোধন করা হয় প্রায় আড়াই বছর আগে। কিন্তু রেলপথটি এখনো কার্যত অচল । এতে প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও বাস্তব সুফল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপৃল) এমন মন্তব্য করেছেন আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক রাজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এই রেলপথে একাধিকবার পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল (ট্রায়াল রান) সম্পন্ন হলেও প্রশাসনিক দুদেশের কুটনৈতিক টানাপড়েনসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে শুরু হয়নি বাণিজ্য কার্যক্রম। কবে নাহাদ ট্রেন চলাচল শুরু হবে বা বাণিজ্য চালু হবে— সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। ফলে পুরো প্রকল্পটি কার্যত ‘অলস অবকাঠামো’ হিসেবেই পড়ে আছে।
আর নিম্নমানের লোহার যন্ত্রাংশ দিয়ে এই রেলপথ তৈরি করায় ধরেছে জং। নেই কোন সংরক্ষন ও তদারকি। এতে প্রকল্পটি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে জানান রাজীব ভুঁইয়া।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। এই রেলপথ চালু হলে তারা নিজেদের রাজ্য থেকেই কম খরচে পণ্য আনতে পারবে। এতে করে আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ার।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে সীমিত পরিসরে রড, সিমেন্ট ও পাথর রপ্তানি হয়, যা মূলত ত্রিপুরার বাজারে যায়। কারণ, ভারতের অন্য রাজ্য থেকে এসব পণ্য আনতে খরচ বেশি পড়ে। কিন্তু নতুন রেলপথ চালু হলে সেই নির্ভরশীলতা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী।
আখাউড়া স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাসিবুল হাসান মনে করেন, রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত হলেও সুযোগ রয়েছে আমদানি বাড়ার। ‘সব ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ দিলে ব্যবসায়ীরা কম খরচে রেলপথে পণ্য আনতে পারবে। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে বলে জানান তিনি।
কবে এই আন্তঃদেশীয় ট্রেন চালু হবে— এই প্রশ্নে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়ার জবাব, ‘কখন ট্রেন চলবে, সেটা পুরোপুরি সরকারি সিদ্ধান্ত। এখন পর্যন্ত আমার কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। উদ্বোধনের প্রায় আড়াই বছর পরেও ট্রেন চলাচলে না থাকা, বাণিজ্য শুরু না হওয়ায় আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ এখন অনিশ্চয়তার প্রতীক। কবে এটি চালু হবে, কতটা বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব কী হবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।
রেলওয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার নিশ্চিন্তপুর পর্যন্ত ১২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। প্রায় ২৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ অংশের কাজ বাস্তবায়ন করে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেক্সমেকো রেল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি দেড় বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারীসহ নানা জটিলতায় কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে ছয় বছরেরও বেশি। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যৌথভাবে রেলপথটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
উদ্বোধনের আগেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই রুট দিয়ে আমদানি-রপ্তানির অনুমতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ভারত থেকে অর্ধশতাধিক পণ্য আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য সব ধরনের পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর জন্য নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস ভবন, প্ল্যাটফর্ম এবং সংযোগ সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর।
এরপর একাধিকবার পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল (ট্রায়াল রান) সম্পন্ন হলেও প্রশাসনিক দুদেশের কুটনৈতিক টানাপড়েনসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে শুরু হয়নি বাণিজ্য কার্যক্রম। কবে নাহাদ ট্রেন চলাচল শুরু হবে বা বাণিজ্য চালু হবে— সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। ফলে পুরো প্রকল্পটি কার্যত ‘অলস অবকাঠামো’ হিসেবেই পড়ে আছে।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে শুরু থেকেই আশাবাদী ছিল তৎকালীন আওয়ামী সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনেক ব্যবসায়ী বলছেন ভিন্ন কথা। এই রেলপথ বাস্তবে ভারতের বাণিজ্যিক সুবিধাই বেশি নিশ্চিত করবে বলেই তাদের মত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রেলপথের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্ব হলো ভারতের ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা চিকেনস নেক নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন। ফলে ভারতের জন্য এটি একটি বড় লজিস্টিক সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে— এতে বাংলাদেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা কতটুকু মিলবে?